নিজ দলের সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়ে গত ২ মার্চ মারাযান মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন মিরু। ঘটনার পর সিঙ্গাইর কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোল্লা মো: দুলালকে প্রধান আসামী করে ১২ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ৪-৫ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন নিহত মিরুর বড় ভাই রেজাউল করিম হিরো। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের ১৫ দিন পার হলেও আজও অধরা রয়েছে মূল ঘাতক ও খুনের পরিকল্পনাকারীরা। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমসহ নিহত ছাত্রলীগ নেতা মিরুর পরিবার, স্বজন ও নিজ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। তবে পুলিশের দাবি, মিরু হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের পাশাপাশি মূল ঘাতকদের গ্রেফতারে জোড় তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙঙ্খলাবাহিনী। সহসাই ঘাতকরা গ্রেফতার হবে।
নিহত ফারুক হোসেন মিরু উপজেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক ও সিঙ্গাইর সরকারি কলেজের ভিপি ছিলেন। তিনি সিঙ্গাইর পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডের আজিমপুর গ্রামের (রংয়ের বাজার) আব্দুল কাদেরের ছেলে। পরিবারের অভিযোগ, পূর্ব শত্রুতা ও আধিপত্ত বিস্তারের জেরে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে নিজ দলের সন্ত্রাসীরা। নৃশংস এই খুনের ঘটনায় ১২ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ৪-৫ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়। মামলার আসামীরা হলেন, পৌর এলাকার আজিমপুর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা ওরফে ধুনাই মোল্লার ছেলে সিঙ্গাইর কলেজ ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক মোল্লা মো: দুলাল (২৪), তার ভাই উপজেলা মটর শ্রমীক লীগের সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দিন আঙ্গুর (৩৪), আলাল মোল্লা (২৮), ইমরান মোল্লা (২০), সোহান মোল্লা (১৭), একই এলাকার সাইফুল ইসলামের ছেলে হিমেল (২৭), তমিজ উদ্দিন তজুর ছেলে আমিনুর (৩২), বাচ্চু মিয়ার ছেলে নাজমুল (৩০), সুকুম আলীর ছেলে রনি (২৫), ইদ্রিস আলীর ছেলে হাবেজ ওরফে হাফেজ, সামছুল হকের ছেলে ইমান আলী (৩০) ও বাবুল হোসেনের ছেলে হৃদয় (২৯)।
আসামীদের মধ্যে ইমরান মোল্লা সোহান মোল্লা ও ইমান আলী গ্রেফতার হলেও এখনো ধরা ছোয়ার বাইরে রয়েছে মুল ঘাতক ও হত্যার পরিকল্পনাকারীরা। এতে ক্ষুব্দ নিহত মিরু তার স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নিন্দার জড় উঠেছে উপজেলার সর্বত্র। খুনিদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে প্রতিদিনই উপজেলার কোথাও না কোথাও মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও শোক র্যালীসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালিত হচ্ছে। এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে। ক্রমেই জোড়দার হচ্ছে মিরু হত্যার বিচারের দাবি।
মিরু হত্যার প্রতিবাদ, খুনিদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন এবং শোক র্যালী করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, মহিলা লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ, মটর শ্রমিকলীগ, ভাষা শহীদ রফিক স্মৃতি ক্রীকেট একাডেমী ও মানবিক সিঙ্গাইর ফাউন্ডেশনসহ নিহত মিরুর সহকর্মী, সহপাঠি, বন্ধু-বান্ধব এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন।
এদিকে মিরু হত্যার প্রতিবাদ ও খুনিদের গ্রেফতার এবং সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবিতে মঙ্গলবার (১৬ মার্চ) বিকালে মানববন্ধন করে উপজেলার ধল্লা ইউনিয়ন ছাত্রলীগ। হেমায়েতপুর-সিঙ্গাইর-মানিকগঞ্জ সড়কের বাস্তা বাসস্ট্যাণ্ডে অনুষ্ঠিত এ মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম।
তিনি বলেন, উপজেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন মিরুকে পরিকল্পিত ভাবে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে। তার শরীরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ৫২ টি আঘাত করা হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আওয়ামী লীগের সকল নেতাকর্মীসহ সিঙ্গাইরবাসীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কোনো ভাবেই এই হত্যাকাণ্ড মেনে নেওয়া যায়না। ঘটনার ১৫ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো ধরা ছোয়ার বাইরে রয়েছ মূল ঘাতক ও হত্যার পরিকল্পনাকারীরা। বিষয়টি নিয়ে স্বরাস্ট্রমন্ত্রীসহ র্যাব ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা হয়েছে। কিন্তু খুনিরা গ্রেফতার হচ্ছেনা। এমনকি হত্যার ইন্ধনদাতাদের কাউকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি। এর দায় এড়াতে পারেনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অনতিবিলম্বে মিরুর খুনি ও ঘটনার ইন্ধনদাতারা গ্রেফতার না হলে কঠিন আন্দোলনের কর্মসূচী দেওয়া হবে। খুনিরা গ্রেফতার ও তাদের সর্বোচ শাস্তি ফাঁসি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
ধল্লা ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন ইনুর সঞ্চালনায় মানববন্ধনে অারো বক্তব্য রাখেন, নবনির্বাচিত পৌর মেয়র আবু নাঈম বাশার, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শহিদুর রহমান, সায়েদুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক ওবায়দুল হক, উপজেলা মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান শারমিন আক্তার, জেলা পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট কহিনুর ইসলাম সানি, ইউপি চেয়ারম্যান শওকত হোসেন বাদল, জাহিদুল ইসলাম ভূইঁয়া, উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি শাহিনুর রহমান ও নিহত ফারুক হোসেন মিরুর বড় ভাই রিয়াজুল করিম হিরো প্রমুখ।
সবার দাবি একটাই, অনতিবিলম্বে মামলার প্রধান আসামী সিঙ্গাইর কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোল্লা মো: দুলাল ও তার বড় ভাই উপজেলা মটর শ্রমীক লীগের সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দিন আঙ্গুরসহ সকল ঘাতক ও ঘটনার পিছনে থাকা ইন্ধনদাতাদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার আইনে তাদের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের হুশিয়ারি দেন তারা।
সহকারি পুলিশ সুপার (সিঙ্গাইর সার্কেল) রেজাউল হক বলেন, ছাত্রলীগ নেতা মিরু হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের পাশাপাশি মূল ঘাতকদের গ্রেফতারের জন্য জোড় তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙঙ্খলাবাহিনী। ইতিমধ্যে মামলার তিন আসামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে দুজন হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্ধী দিয়েছেন। বাকি আসামীদের সহসাই গ্রেফতার করা হবে। ঘাতকরা যত ক্ষমতাধরই হোক না কেন কাউকে ছাড় দেওয়া হবেনা। তাদের আইনের মুখোমুখি করে শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
সম্পাদক: মোবারক হোসেন
প্রকাশক: জসিম উদ্দিন সরকার
২২৬, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭
ইমেইল: janashokti@gmail.com